
আতাউর রহমান সানী : রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। এ উপজেলায় এক হাজারের অধিক শিল্প কারখানা থাকলেও স্থানীয় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেশি। এখানকার কারখানা গুলো স্থানীয়দের চাকরিতে নেয় না এমন অভিযোগ বহুদিনের। তবে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও গৃহিনীদের আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মনির্ভরশীলভাবে গড়ে তুলতে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম ’প্রজেক্ট ওয়ান থাউজেন্ড’ নামে এক ব্যাতিক্রমী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেখানে কাউকে ছুটতে হবে না চাকরীর পেছনে।
ইউএনও’র এ ‘ওয়ান থাউজেন্ড প্রজেক্ট’ বদলে দিচ্ছে গ্রামীন অর্থণীতির চিত্র। ইতোমধ্যে কয়েক শতাধিক নারী-পুরুষ, তরুণ ও শিক্ষার্থী এই প্রকল্পের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। এতে উপজেলায় কমছে বেকারত্বের সংখ্যা। এ প্রকল্প হাজারো বেকারকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
জানা গেছে, গত বছরের ৫ ই আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর কয়েকমাস সাইফুল ইসলাম রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদান করে। তখন সারাদেশে অস্থিশীল পরিস্থিতি থাকলেও রূপগঞ্জ ছিল অনেকটা ব্যাতীক্রম। দেশের এ অস্থিশীল পরিস্থিতি মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখেছেন রূপগঞ্জের এক হাজার যুবককে সরকারিভাবে প্রশিক্ষনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী হিসেবে গড়ে তোলার। এ কারণে গত কয়েক মাস আগে প্রজেক্ট ওয়ান থাউজেন্ড প্রকল্প হাতে নেন। সরকারি এই বিশেষ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, আধুনিক কৃষি, সেলাই, বিউটি পার্লার, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার এবং ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে। শুধু প্রশিক্ষণই নয় উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় উপকরণ, প্রাথমিক মূলধন এবং ব্যবহারিক নির্দেশনা, যাতে প্রশিক্ষণ শেষে তারা সরাসরি আয়ের কাজে যুক্ত হতে পারেন।
কথা হয় মুড়াপাড়া মঙ্গলখালী এলাকার ইয়াসমিন আক্তারের সঙ্গে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই নিজে কিছু চেষ্টা ছিল। কিন্ত বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও চেষ্টা করছিলাম ঘরে বসে কিছু করার। কয়েক বছর আগে মুরগীর খামার শুরু করি। তবে প্রশিক্ষণ না থাকায় সব মুরগী মারা যায়। তবু আমি হাল ছাড়ি নি। কয়েক মাস আগে ইউএনও’ স্যার সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানতে পারি। এ প্রকল্প থেকে হাস মুরগীর পালনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে আবারো খামার শুরু করি। এখন টিকা ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিজেই করতে পারছি। খামার থেকে ২০-৩০ হাজার টাকা প্রতিমাসে লাভ হচ্ছে।
উপজেলার মুড়াপাড়া মঙ্গলখালী এলাকার গৃহিনী শান্তা আক্তার। তার স্বামী ইয়াসিন মিয়া ঢাকার একতটি বেকারীতে স্বল্প বেতনে চাকরী করতেন। সেই বেতন দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। সেখানে সঞ্চয় তো অকল্পনীয় ব্যাপার। অভাবের কারণ সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিস থেকে হাঁস মুরগী পালনের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে ছোট করে নিজের বাড়িতে খামার গড়ে তুলি। বর্তমানে আমার খামারে তিনশতাধিক হাঁস মুরগী রয়েছে। মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হয়। এখন সংসার চালানো পাশাপাশি সঞ্চয়ও করতে পারছি।
শিক্ষার্থী ফ্রিল্যান্সার ফাহিম হোসেন বলেন, আমি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় থেকে অটো মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ছি। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের খরচ চালাতে আমার বাবাকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখার ইচ্ছা আমার ছোটবেলা থেকেই ছিল। কয়েক মাস আগে উপজেলা থেকে সরকারিভাবে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স করি। গ্রাফিক্স ডিজাইন করে আমি ফ্রিল্যান্সিং করে বাড়তি টাকা আয় করছি। এ আয় থেকে আমার লেখাপড়ার খরচ আমি চালাই।
রিনা বেগম নামের আরেকজন জানান, গরু পালনের প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি দুগ্ধ গাভী লালন করছি। প্রতিদিন দুধ বিক্রি করে ভালো আয় হয়। সংসারের খরচের পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনাতেও সহযোগিতা করতে পারছি।
ভিংরাবো গ্রামের আফরোজা ইসলাম বলেন, বিউটি পার্লারের কাজ শিখে বাড়িতে ঘরোয়াভাবে শুরু করেছি। এখন অনেক নারী সাজগোজের জন্য আমার কাছে আসে। এতে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হয়। এখন আর আমাকে কারো উপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে না। আমি নিজের খরচ চালিয়ে সংসারের খরচও চালাতে পারছি।
মিথিলা নামের আরেক উদ্যোক্তা বলেন, “আগে সংসারে অভাব ছিল। এখন বিউটি পার্লারের কাজ করে শুধু স্বাবলম্বী হয়নি, বরং দুইজন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছি।
ভুলতার হাসিনা বেগম জানান, “সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে উপজেলা প্রশাসন থেকে সেলাই মেশিন পেয়েছি। এখন ঘরে বসেই মাসে ১৫ হাজার টাকার বেশি আয় করি। আগে যারা সাহায্য করতো, এখন তারাই অবাক হয় আমার উন্নতি দেখে।”
স্থানীয়রা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্প শুধু পরিবার কেন্দ্রীক পরিবর্তনই আনছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রীক গতিশীলতায়ও অবদান রাখছে। নারী, পুরুষ, যুবক-যুবতী ও শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে আয় করছে, নিজ নিজ পরিবারকে সচ্ছল করছে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলছে।
ফলে রূপগঞ্জের গ্রামগুলোতে অভাব-অনটনের জায়গায় তৈরি হচ্ছে আত্মবিশ্বাস ও উন্নতির গল্প। ইউএনও’র এই উদ্যোগকে এখন অনেকেই দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি আদর্শ মডেল প্রকল্প হিসেবে দেখছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের ‘ওয়ান থাউজেন্ড প্রজেক্ট’ মূলত এক হাজার পরিবারকে স্বাবলম্বী করার একটি পরিকল্পনা। আমরা চাই মানুষ শুধু সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে দক্ষতা অর্জন করে দীর্ঘমেয়াদে নিজের পায়ে দাড়াতে পারে। এখন পর্যন্ত দুই শত নব্বই জনের অধিক তরুণ-তরুণী নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। প্রকল্পে যারা যুক্ত হচ্ছেন, তাদের হাতে প্রাথমিক মূলধন, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ তুলে দিচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি, যাতে তারা যেকোনো সমস্যায় দ্রুত সহায়তা পান।
তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়। বরং প্রত্যেককে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তিনি নিজেই আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন, অন্যদেরকেও কাজ দিতে পারেন। ইতোমধ্যেই অনেক নারী-পুরুষ সফলভাবে ব্যবসা শুরু করেছেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই প্রকল্পকে আরও সম্প্রসারণ করা হবে।















