
স্টাফ রিপোর্টার : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালময়ের নির্দেশ উপেক্ষা করেই চলছে রূপগঞ্জের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো রমরমা বাণিজ্য চললেও মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করেননি। গত বছর দু’চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে লোক দেখানো। রূপগঞ্জে প্রায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র কয়েকটির লাইসেন্স আছে বলে জানা গেছে। ভুল চিকিৎসা আর গলাকাটার কারণে রোগীরা নানাভাবে প্রতারিত হচ্ছে। এ উপজেলায় ব্যাঙ্গের ছাতার মতো প্রায় অর্ধশতাধিকের উপর বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। আর সে গড়ে উঠা এ হাসপাতাল গুলোর বেশিরভাগেরই নেই অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
জানা গেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত বছরের গত ৩ মার্চ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ভুলতা এলাকায় ৫ টি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় হাসপাতালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, প্যাথোলজি রিপোর্টে স্বাক্ষর নকল, নির্দিষ্ট ফি এর চেয়ে বেশি টাকা নেয়া, সেবার মূল্যে তালিকা না থাকার দায়ে মেমোরি ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালকে ২ লাখ টাকা, ভুলতা জেনারেল হাসপাতালকে ৩০ হাজার টাকা, রূপগঞ্জ সেন্ট্রাল হসপিটালকে ১ লাখ টাকা ও নিউ লাইফ জেনারেল হাসপাতালকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এদিকে, নির্দিষ্ট কাগজপত্র না থাকায় অভিযানে খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে কর্মকর্তা- কর্মচারীরা পালিয়ে যাওয়ায় দায়ে ভুলতা মর্ডান হাসপাতালকে সিলগালা করা হয়। স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌস এ অভিযান অব্যাহত রাখার কথা বললেও অভিযানের ধারাবাহিকতা শুধু মুখেই মুখেই রয়েছে গেছে। ওই অভিযানের প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। অর্ধশতাধিকের বেশি হাসপাতালের মাঝে মাত্র ৫ টি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনার পর আর কোন অভিযান পরিচালনা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এখনো উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ হাসপাতালে অভিযান করা বাকী রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। বাকী ৯০ ভাগ হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করলে আরো অনেক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বেড়িয়ে আসবে বলে দাবি স্থানীয়দের। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে ম্যানেজ করে হাসপাতাল মালিকরা বাকী হাসপাতাল গুলোতে অভিযান পরিচালনা বন্ধ রেখেছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। এতে করে ধ্রুমজাল তৈরী হয়েছে জনমনে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভেজাল খাদ্যের কারণে মানুষ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। লাভজনক ব্যবসা হওয়ার কারণে অনেকেই নামছে হাসপাতাল ব্যবসায়। যে হাসপাতাল গুলোর বেশিরভাগই অনুমোদন, পরিবেশের ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনী কাগজপত্র নেই। সার্জারী ও বিভিন্ন অপারেশনে ব্যবহার করা হয় মরচেপড়া মেয়াদহীন অপারেশন সরঞ্জাম। আর হাসপাতাল গুলোতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ডাক্তার দেখানোর পর দিয়ে দেওয়া হয় অহেতুক বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা। আর এসকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে গিয়ে পকেট ফাকা হয় রোগীদের। বেসরকারি হাসপাতালকে ঘিরে রূপগঞ্জে গড়ে উঠেছে একটি দালাল সিন্ডিকেট। হাসপাতাল গুলোতে রোগী পাঠালেই রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা থেকে ২০-৩০ শতাংশ কমিশন প্রদান করা হয়। এছাড়া যে দালালরা হাসপাতাল গুলোতে রোগী পাঠান তাদের বছরে কয়েকবার কক্সবাজার, সিলেট, বান্দরবান, রাঙ্গামাটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়। রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষায় অতিরিক্ত টাকা আদায় করে দালালদের কমিশন ও ভ্রমণের টাকা যোগান দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ উপজেলায় ভুলতা জেনারেল হাসপাতাল, ডিকেএমসি হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনিস্টিক সেন্টার, পূর্বাচল মেডিলাইফ স্পেসালাইজড হাসপাতাল, নয়নতারা চক্ষু হাসপাতাল, কেপিসি জেনারেল হাসপাতাল, মেমোরি ডায়াগনিষ্টিক এন্ড হাসপাতাল, রূপসী স্বদেশ সেন্ট্রাল হাসপাতাল, স্বদেশ জেনারেল হাসপাতাল, ক্লিনিকেয়ার ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার এন্ড হাসপাতাল, বেলদী ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, রূপগঞ্জ পপুলার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, এভাকেয়ার হাসপাতাল, এসএমএস হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, মুড়াপাড়া জেনারেল হাসপাতাল, জহুরুন্নেসা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, ভুলতা এপোলো এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, বরপা মক্কা ল্যাব এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, মেডিস্কিন হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টার, সিপিএইচডি নারায়ণগঞ্জ হেলথ কেয়ারসহ সব মিলিয়ে রূপগঞ্জ উপজেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনিষ্টিক হাসপাতাল রয়েছে।
এর অধিকাংশই অনুমোদনহীন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রহীন। তারপরও প্রভাব খাটিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে চিকিৎসাসেবার নামে দেদার চলছে এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রথমে খাজনা রসিদ, ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর রিটার্ন, ফায়ার সার্ভিস, কলকারখানা, ভ্যাট ও অনাপত্তিপত্র নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয়। পরিবেশের আবেদনের ‘মানি রিসিপ্টের কপি’ নিয়ে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয়। এই মূলে প্রথমে লাইসেন্স দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে পরে পরিবেশ অধিদপ্তর যাচাই-বাছাই করে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেয় না। ছাড়পত্র না পাওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নবায়ন করতে গেলে আর নবায়ন হয় না। এছাড়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি, ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্যাথলজিস্ট, সনোলজিস্ট ও রেডিওগ্রাফার পদে জনবল থাকা আবশ্যক। সে ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে নিয়োগ দেখালেও বাস্তবিক অর্থে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই সব ধরনের জনবল নেই। তবুও চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও তিন শিফটে ডিপ্লোমা সনদধারী নার্স থাকার কথা। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতাল ও ডায়াগনিষ্ট সেন্টারে নার্সের পরিবতে শিক্ষার্থী ও অভিজ্ঞ আয়া দিয়ে চলছে কার্যক্রম। আবাসিক মেডিকেল অফিসারও নেই। এছাড়া হাসপাতাল গুলোতে পরীক্ষা নিরাক্ষার জন্য আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, এক্সরে মেশিনসহ ঢাকা ও সরকারি হাসপাতাল গুলো থেকে পুরাতন ও অকোজ মেশিন কিনে ঠিক করে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর হাসপাতাল গুলোতে টেকনিশিয়ান না থাকার কারণে রিপোর্ট করেন মেশিন অপারেটর। এ রিপোর্টের প্রায় সময় বিভিন্ন ভুল দেখা যায়। আর হাসপাতাল গুলোতে ভুল চিকিৎসা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অকালে ঝড়ছে বহু প্রাণ। ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ভুলতা জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় আমেনা বেগম নামে গৃহবধূর গর্ভের শিশুর মৃত্যু হয়। ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর রূপগঞ্জ পপুলার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনিষ্টিক সেন্টারে টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় ইভা আক্তার নামে এক ৫ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়।
পরে শিশুর লাশ আটকে রেখে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বিষয়টি রফদফা হয়। চলতি বছরের প্রথমদিকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যু ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ইছাখালী এলাকায় মুড়াপাড়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির সামনে কোন প্রকার সাইনবোর্ড ছাড়াই হাসপাতাল চালানো হচ্ছে। হাসপাতালের মেয়াদোর্ত্তীণ অপারেশন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের ভেতরে যেন ভূতূরে পরিবেশ বিরাজ করছে।
নাসিমা আক্তার নামে এক ভুক্তভোগী জানান, আমি আমার মেয়ে সাদিয়াকে নিয়ে মুড়াপাড়া বাজার এলাকার এভেয়ার কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে সিজার করার জন্য ভর্তি করাই। ভর্তির হওয়ার পর হাসপাতালের পরিবেশ দেখে ওইদিনই হাসপাতাল থেকে অন্যত্র চলে যেতে চাইলে তারা আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা রেখে দেন। ভর্তি হয়ে ২ ঘন্টা থাকার পর ১০ হাজার টাকা কিভাবে হলো সেটির কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা নানারকম কারণ দেখাতে থাকে। পরে জানতে পারি হাসপাতালটির কোন অনুমোদন নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, রূপগঞ্জের বেশকয়েকটি হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ভাল হলেও বেশির ভাগই খারাপ। প্রয়োজনের বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা দেওয়া। আবার কিছু কিছু হাসপাতাল রয়েছে যেখানে নিয়ে গেলেই অতিরিক্ত টাকায় আদায়ের জন্য ভর্তি করতে বলেন। আমরা সরকারি হাসপাতাল গুলোতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকার কারণে যাওয়া হয় না। কিন্তু যদি প্রাইভেট হাসপাতাল গুলোতে নোংরা পরিবেশসহ নানা জটিলতা থাকে তাহলে আমাদের বিশ^াসের জায়গা কোথায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি হাসপাতালের পরিচালক বলেন, একটি হাসপাতাল চালাতে অনেক বেশি খরচ। হাসপাতাল চালাতে হলে ম্যানেজার, ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ বিভিন্ন স্টাফ কাজ করাতে হয়। এসব খরচ চালাতেই ডাক্তারকে বেশিবেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা দিতে বলা হয়।
জীবনতরী নামে স্থানীয় একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের সভাপতি কাজী মাহবুব বলেন, স্বদেশ সেন্ট্রাল হাসপাতালের কয়েকদিন পরপরই ভুল চিকিৎসায় রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়া আমাদের সংগঠনের অনেকে রক্ত দিতে গিয়ে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারণে ভোগান্তিতে পড়ে।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌস বলেন, হাসপাতালকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছি। আবারো অনুমোদিত হাসপাতাল গুলোতে অভিযান চালানো হবে। সকল হাসপাতালকে সরকারি লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। সরকারিভাবে বেধেঁ দেওয়া সময়ের মধ্যে যারা নিবন্ধন না করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এএইচএস রাশেদ বলেন, ২০০৮ সালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী যেসকল হাসপাতাল পরিবেশের ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্য তাদেরকে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। একটি হাসপাতাল যদি ৫০ বেডের উপরে হয় তাহলে হাসপাতালটিকে ইটিপি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

















