শেষ বিদায়েও বাবা–মায়ের সঙ্গ পেল না ফাতেমা

স্টাফ রিপোর্টার : দশ মাস বয়স—হাসি, খেলা আর প্রথম শব্দ শেখার বয়স। বাবা–মায়ের স্বপ্নের আলো হয়ে বড় হওয়ার কথা ছিল ছোট্ট ফাতেমার। কিন্তু এক মুহূর্তের ভূমিকম্পই থামিয়ে দিল সেই যাত্রা। ক্যানেলপাড়ের মাটির ঘ্রাণে চিরনিদ্রায় শুয়ে গেল সে—শেষ বিদায়েও দেখতে পেল না তার মা–বাবাকে।
শুক্রবার সকালের স্বাভাবিক সময়। কুলসুম বেগম ঘর সামলিয়ে বাবার বাড়ি যাচ্ছিলেন, কোলে ছিল ফাতেমা। হঠাৎ ভূমিকম্পের কম্পনে পাশের বাড়ির উঁচু দেয়াল ভেঙে পড়ল ঝড়ের গতিতে।
প্রতিবেশী ইমতিয়াজ ভূঁইয়া দৌড়ে গিয়ে দেখেন—মাটি আর ধুলোর নিচে চাপা পড়ে আছে কুলসুম ও ছোট্ট ফাতেমা।

“ইট সরাইতে সরাইতে ফাতেমারে বাহির করলাম, কিন্তু বাঁচানো গেল না।” — বললেন তিনি।
দুপুরের পর বাড়ির আঙিনায় নামাজে জানাজা। স্থানীয় কবরস্থানে প্রায় ৩০০ মানুষ ছোট্ট ফাতেমার শেষযাত্রায় অংশ নিলেন। কিন্তু নেই বাবা—আব্দুল হক।
স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে দাফনের খবরও ফোনে জানতে হয়েছে তাকে।
ফাতেমার খালু মোহাম্মদ হোসেনের কথায় মানুষের বুক কেঁপে ওঠে—
“দুপুর থেইকা ঘুরতেছি—ইউএস-বাংলা, ঢামেক, ন্যাশনাল—কোথাও সিট নাই। মাথায় আঘাত লইয়া মানুষ অচেতন, তাও ভর্তি নেব না কয়। কেমন করে বাড়ি নেব?”

কুলসুমকে শেষমেশ নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালে নিতে চায় পরিবার। কিন্তু পথে পৌঁছানো পর্যন্ত তার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নেই—স্বজনদের চোখেমুখে সেই আতঙ্ক স্পষ্ট।
স্থানীয় মোঃ তুহিন মিয়া বললেন, আব্দুল হকের দুই মেয়েকেই মানুষ করার বড় স্বপ্ন ছিল।
“ওই মানুষটা প্রায়ই বলত—আমি কষ্ট করে আমার দুই মেয়েকে মানুষ করব, ডাক্তার বানাব। গরিব মানুষের ফ্রি চিকিৎসা করবে আমার মেয়েরা। কিন্তু ছোট্ট ফাতেমা ডাক্তার তো দূরের কথা—ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও পেল না।”
“প্রাণের টুকরারে দাফন করার সময় একবারও দেখতে পারলাম না। কোলে নিতে পারলাম না। আল্লাহ, এমন দিন যেন কোনো বাবার ভাগ্যে না আসে।”
দুপুরে ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যান ইউএনও সাইফুল ইসলাম। তিনি দেখেন—দেয়ালটি ছিল সম্পূর্ণ অনিয়মে নির্মিত।
১০ ফুটের বেশি উঁচু সেই দেয়ালে ছিল না কোনো রড, না পিলার।
“এমন দেয়াল তো ভারসাম্য রেখেই দাঁড়াতে পারে না,” বলেন ইউএনও।
তিনি জানান, ইউনিয়নে অনেক ভবন ও প্রাচীর নিয়ম না মেনে নির্মিত হয়েছে; ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হবে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফাতেমার দাফনে পরিবারকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দম্পতির বড় মেয়ে দুই বছরের নুসাইবা জান্নাত সেদিন নানাবাড়িতে ছিল। সে জানেই না তার ছোট বোন নেই।
নুসাইবার নিষ্পাপ মুখ এখন পরিবারের সামনে একমাত্র সান্ত্বনা—কিন্তু সেই সান্ত্বনাতেও যেন লেগে আছে না ফেরার দেশের কান্না।