
শরীফ হোসেন : রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার অবস্থান। এ উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে এক হাজারের অধিক শিল্প কারখানা রয়েছে। এ উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস। পুরো উপজেলা জুড়ে তিতাস গ্যাস এন্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানীর প্রায় ৩৫ হাজারের অধিক আবাসিক সংযোগ রয়েছে। এসকল অবৈধ সংযোগের ৯৫ ভাগ সংযোগই অবৈধ। এ সংযোগ গুলো নিম্নমানের পাইপ এবং সামগ্রী ব্যবহার করে দেওয়া হয়েছে। জরাজীর্ণ লোহার পাইপ, এমনকি মাটির ওপর দিয়ে প্লাস্টিকের পাইপ ও হুইস পাইপের মাধ্যমেও দেওয়া হয়েছে অবৈধ সংযোগ। অবৈধভাবে নিম্নমানের পাইপ স্থাপন, রাইজার, রেগুলেটরের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ নেওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। আর এসকল অবৈধ সংযোগ গুলো দিতে প্রতি সংযোগে গ্রাহককে গুনতে হয়েছে ৬০-৮০ টাকা পর্যন্ত আওয়ামীলীগ নেতা ও দালাল চক্রকে দিতে হয়েছে। এছাড়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ম্যানেজ করে প্রতি সংযোগ প্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা নিয়ে পূনরায় সংযোগ দেয় দালাল চক্র ও আওয়ামীলীগের নেতারা। এদিকে, গত ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর টাকা নিয়ে পূনরায় সংযোগ দিচ্ছে বিএনপি নেতারা। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হওয়ায় এখন বিচ্ছিন্ন করতে আতঙ্ক কাজ করে তিতাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে। তিতাসের গ্যাসের অবৈধ সংযোগে প্রায় শতকোটি টাকা আওয়ামীলীগ নেতাকর্মী, দালাল চক্র ও তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের পকেটে ঢুকেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে প্রয় দুই হাজার। তিতাসের কয়েকজন কর্মকর্তাকে মোটা অংকের মাসোয়ারার মাধ্যমে ম্যানেজ করে রূপগঞ্জের প্রায় ২ শতাধিক কারখানা ও বেকারীর তিতাসের বানিজ্যিক ও ইন্ডাসট্রিয়াল গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসকল বানিজ্যিক লাইন থেকে প্রতিমাসে প্রায় ২০ লাখ টাকা মাসোয়ারা তোলেন দালাল চক্র ও তিতাসের কয়েকজন কর্মচারী। এসকল অবৈধ আবাসিক সংযোগ, অবৈধ বানিজ্যিক ও ইন্ডাসট্রিয়াল সংযোগে প্রতিমাসে প্রায় কোটি কোটির গ্যাস ব্যবহার হয়। এ অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে সরকারের রাজস্বের হার শূন্য। এতে সরকার বছরে যেমন কয়েকশত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, অপরদিকে, এসব অবৈধ সংযোগ থেকে ঘটছে দুর্ঘটনা। স¤প্রতি গত ২৫ অক্টোবর রাতে রূপগঞ্জের ডহরগাও এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে বিস্ফোরণ হয়ে ৬ জন দগ্ধ হয়েছে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে রূপগঞ্জের সকল শ্রেনি-পেশার মানুষের মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তিতাস গ্যাস আবাসিক সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই বৃদ্ধি পায় এই অবৈধ সংযোগ নেওয়ার তোড়জোড়। আর এই সুযোগটি কাজে লাগান তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মী এবং অসাধু দালালচক্র। তাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট প্রতিটি আবাসিক অবৈধ গ্যাস সংযোগের জন্য নিয়েছে ৬০-৮০ হাজার করে টাকা। উপজেলার তারাবো, বিশ্বরোড, মৈকুলি, খাদুন, কাহিনী, মুড়াপাড়া, বানিয়াদি, হাটাবো, কালি, আমলাবো, কাঞ্চন, নলপাথর, গোলাকান্দাইল, হোড়গাঁও , ডরগাঁও, সাওঘাট, ভুলতা, গন্ধর্রবপুর, রূপসি, নতুন বাজার, বরপা, আড়িয়াবো, সুতালারা, পাড়াগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতে রাস্তা কেটে হাইপ্রেসার লাইন ছিদ্র করে ২-৩ ইঞ্চি এবং ১ ইঞ্চি ব্যাসের নিম্নমানের লোহার বা প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে নেওয়া হয়েছে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ। নিম্নমানের পাইপের কারণে খুব অল্পদিনেই এসব সংযোগে তৈরি হয়েছে লিকেজ। অবৈধ গ্যাস সংযোগ সহজলভ্য হওয়ায় নতুন বাড়িঘর এবং বহুতল ভবনগুলোতেও অবৈধ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব সংযোগের জন্য কোনো ধরনের মাসিক বিল দিতে হয় না গ্রাহককে। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
অবৈধ সংযোগের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ঃ কায়েতপাড়া ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে কায়েতপাড়া ইউনিয়নের আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদ আলীর নেতৃত্বে। এ অবৈধ সংযোগ দিতে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছে গ্রাহকদের কাছ থেকে। গোলাকান্দাইল ইউনিয়নে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুল হাসান তুহিন, গোলাকান্দাইল ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম, যুবলীগ নেতা কাজল, যুবলীগ নেতা আবু নূর আলম, গ্যাস অফিসের দালাল রাজীবের নেতৃত্বে পুরো ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজারের অধিক অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ভুলতা ইউয়িনের পাচাঁইখা, আমলাবো, শিংলাবো যুবলীগ নেতা শাহ-আলম, কাঞ্চন পৌরসভার সব এলাকায় কাঞ্চন পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসূল কলির নেতৃত্বে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গোলাম রসূল কলি গ্রাহকদের সংযোগ বৈধ করে দেওয়ার কথা বলে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করে নিয়েছিল। সেই টাকাও আজ পর্যন্ত পায়নি গ্রাহকরা। তারাব পৌরসভার বরপা এলাকায় সাবেক কাউন্সিলর আশরাফুল, যুবলীগ নেতা বায়জিদ সাউদের নেতৃত্বে টাকা নিয়ে প্রায় ৩ হাজার অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মুড়াপাড়া, রূপসী, মৈকুলী, বিশ^রোড ও তারাবো এলাকায় আওয়ামীলীগ ও যুগলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা টাকার বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পুরো উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজারের বেশি অবৈধ আবাসিক সংযোগ রয়েছে। আর প্রায় শতাধিকের উপরে বানিজ্যিক গ্যাস সংযোগ রয়েছে। যেগুলো ব্যবহার করা হয় রেস্টুরেন্ট ও বেকারীতে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ ছিলো আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও তিতাস অফিসের কিছু কর্মচানরী। এছাড়া ইন্ডাসট্রিয়াল লাইনের প্রেসার কামানো বাড়ানোতেও প্রচুর দূর্নীতি হয়। এ গুলো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে তিতাসের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহীতাদের মধ্যে একজন গোলাকান্দাইল এলাকার সুমন চন্দ্র জানান, আমার বাসায় গ্যাস সংযোগের জন্য দালাল চক্রকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। সাথে বাড়ির দলিল, পর্চা ও ছবিও জমা নিয়েছেন। তিনি বলেছেন দ্রæত গ্যাস সংযোগটি বৈধ করে দেবেন। কিন্তু আর বৈধ করে দেয়নি, তাই বর্তমানে অবৈধভাবেই গ্যাস ব্যবহার করছি।
অবৈধভাবে সংযোগ নেয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, তারা ধার দেনা করে, গরু বাছুর, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে গ্যাস সংযোগের জন্য টাকা দিয়েছেন আওয়ামীলীগ নেতা ও দালাল চক্রকে। দালাল চক্র এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া গ্রাহকদের বুঝিয়েছেন তাদেরকে সরকারিভাবে বৈধ করে দিবেন। এখন টাকা দিয়ে বিপাকে পড়েছেন অবৈধ সংযোগ নেওয়া গ্রাহকরা। দালালচক্ররা বৈধ করে দিচ্ছেন না। অবৈধ সংযোগ নেয়া গ্রাহকদের দাবি, তাদের সংযোগ গুলো যাতে বৈধ করে দেয়া হয়।
এদিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে গত কয়েক বছরের এক ডজনের অধিক বিস্ফোরন ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল রূপসি এলাকায় রূপসী-কাঞ্চন সড়কে হাই প্রেসার পাইপ লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ নেওয়া সার্ভিসটি থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১২ ঘণ্টা ওই এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। পরে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পাইপলাইন মেরাম ত করলে পুনরায় গ্যাস সংযোগ পান। ২০১৯ সালে ২১ এপ্রিল ঢাকা সিলেট মহাড়কের সাওঘাট এলাকয় হাই প্রেসার তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইন থেকে একটি পাকা বাড়িতে অবৈধভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ নেয়া হয়। সেখানে পাইপ লাইন লিখেজ হয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই শামীম ও হেলাল বিশ্বাস নামের দুজন ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন আরো ছয় জন। বিস্ফোরণে ওই বাড়ির টাকা দেওয়াল উড়ে যায়। ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বানিয়াদি এলাকায় অবৈধভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ নেওয়া দুইটি রাইজার থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আগুন ধরে যায়। ২০২২ সালের ১৪ মার্চ কাঞ্চন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এ সমড় গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে তারা ফিরে যান। ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি গোলাকান্দাইল, বাঘমুড়া হিজর গাছ পর্যন্ত ৬ শতাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। পরে দালাল চক্র পুনরায় সংযোগ দিয়ে দেয়। ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর মৈকুলী ও বরপা এলাকায় প্রায় দুই হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় । পরে পুনরায় আবার দালাল চক্র গ্যাস সংযোগ দিয়ে দেয়। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় ২০২১ সালের ২৮ মে যাত্রামুড়া তিতাস গ্যাস অফিসে হামলা করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া লোকজন। কায়েতপাড়া এলাকায় বিশেষ কায়দায় বেলুনে গ্যাস মজুদ রেখে ব্যবহার করে ওই এলাকার মানুষ। পরে এ বিষয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষের নজরে আসলে ২০২১ সালের ৩০ মার্চ ওই এলাকার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর খাদুন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ৩০০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে দালাল চক্র পুনরায় আবার গ্যাস সংযোগ দিয়ে দেয়। একই বছরে ৫ সেপ্টেম্বর আদুরিয়া ও মোহন এলাকায় ৫০০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ওই এলাকায় ও দালাল চক্র মোটা অংকের টাকা নিয়ে পুনরায় গ্যাস সংযোগ দিয়ে দেয়। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে ২০২২ সালের ২ জুলাই বড় এলাকায় হামলার শিকার হন তিতাস গ্যাসের বিচ্ছিন্ন কারী দলের সদস্যরা। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়।
অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের যাত্রামুড়া কার্যালয়ের ডিজিএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অবৈধ সংযোগগুলোতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় পাইপে এই লিকেজের সৃষ্ট হচ্ছে। ঘটছে বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনা। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান চলমান রযয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।